• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ফারুক মেহেদী : সত্যের সন্ধানে এক সাংবাদিকের যাত্রা

ফারুক মেহেদী : সত্যের সন্ধানে এক সাংবাদিকের যাত্রা

তাহাজীব হাসান

দেশের সাংবাদিকতায় যে কজন মানুষ নিষ্ঠা, সাহস আর অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নিজেদের আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ফারুক মেহেদী। উনার কাগুজে নাম মোহাম্মদ ফারুক আহমেদ।  বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠের হেড অব নিউজ। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে সমান দক্ষতায় কাজ করে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।

 

শৈশব ও প্রেরণা

শৈশব থেকেই ফারুক মেহেদীর আগ্রহ ছিল সংবাদপত্রে। তাঁর চাচা স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদদাতা ছিলেন। বাড়িতে নিয়মিত খবরের কাগজ আসত, আর সেটিই ছিল তাঁর কৌতূহলের খোরাক। কীভাবে একটি খবর তৈরি হয়—এই প্রশ্ন তাঁকে টেনেছিল সংবাদমাধ্যমের দিকে। কচিকাচার আসরে অংশগ্রহণ ও স্কুল–কলেজে লেখালেখি ছিল তাঁর হাতেখড়ি। সেখান থেকেই শুরু হলো সাংবাদিকতার পথে যাত্রা।

 

শিক্ষা ও ছাত্র রাজনীতি

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ফারুক মেহেদী প্রথম আলো পত্রিকার সংবাদদাতা হন। পাশাপাশি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে সহসাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। তবে রাজনীতির জটিলতা ও অনিয়ম তাঁকে হতাশ করে। রাজনীতির ক্যারিয়ার গড়ার পরিবর্তে তিনি সাংবাদিকতার পথকেই বেছে নেন। সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

 

সাংবাদিকতা জীবন

দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। যদিও দীর্ঘ সময় টিভিতেও ছিলেন, তবুও তাঁর আসল ভালোবাসা সংবাদপত্র। তাঁর বিশ্বাস—একটি লিখিত প্রতিবেদন মানুষের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।তিনি বিশেষ দক্ষ অর্থনীতি, রাজস্বনীতি, কর ফাঁকি ও মুদ্রা পাচার–সংক্রান্ত প্রতিবেদনে। জটিল ডকুমেন্ট ঘেঁটে সহজ ভাষায় সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পারাটাই তাঁর শক্তি।

 

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত

২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে তাঁর প্রতিবেদন আজও স্মরণীয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি গোপন রিপোর্ট ফাঁস করে তিনি কালের কণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন তিন দিন ধরে। সেই প্রকাশনা দেশে আলোড়ন তোলে, আর কালের কণ্ঠের সার্কুলেশন বেড়ে যায় কয়েকগুণ।এই প্রতিবেদনে তিনি প্রমাণ করেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো সোর্সের আস্থা রক্ষা। যত বড়ই চাপ আসুক, তিনি কখনোই তাঁর সূত্রের নাম ফাঁস করেননি। তাঁর কাছে সাংবাদিকতার প্রথম নীতি হলো আস্থার মূল্য দেওয়া।
সাংবাদিকতা দর্শনফারুক মেহেদী সাংবাদিকতাকে কেবল পেশা হিসেবে দেখেন না। তাঁর মতে, সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—• সত্যকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা,• মানুষের পাশে দাঁড়ানো,• এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।তিনি প্রায়ই তরুণ সাংবাদিকদের বলেন: “সাংবাদিকতা চাকরি নয়, এটি দায়বদ্ধতা।”

 

দৃষ্টিভঙ্গি

তিনি সাংবাদিকতাকে সবসময় “more than a job” হিসেবে দেখেন। দুর্নীতি, কারসাজি, বৈষম্য ইত্যাদি সামাজিক সমস্যাকে চিহ্নিত করে পরিবর্তনের জন্য কাজ করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।ডিজিটাল যুগে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পরিবর্তনকেও তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন। তাঁর মতে, প্রিন্ট থেকে ডিজিটালে রূপান্তর একটি বাস্তবতা, এবং সাংবাদিক ও মিডিয়া উদ্যোক্তাদের উচিত এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট–কেন্দ্রিক করে তোলা।

 

অল্প কথা বলতে গেলে ফারুক মেহেদীর গল্প কেবল একজন সাংবাদিকের নয়, বরং একটি প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি। তিনি দেখিয়েছেন, নিষ্ঠা, সাহস ও সত্যের প্রতি অবিচল আস্থা থাকলে সাংবাদিকতা সমাজে পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি ও বস্তুনিষ্ঠ লেখনী ভবিষ্যতের সাংবাদিকদের জন্য এক অমূল্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৩পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।